রহস্যাবৃত একটি রোগ

রহস্যাবৃত একটি রোগ

ডা: এ কে এম ফজলুল হক

0
SHARE

সময় সংবাদ রিপোর্ট:পাইলসের সাথে আমরা হাজার বছর ধরে পরিচিত। কিন্তু এখনো পুরো বিষয়টি আমাদের আছে অস্বচ্ছ ও ভ্রান্ত ধারণায় পূর্ণ এবং সংস্কারের ঘেরাটোপে বন্দী।

পাইলসের সংজ্ঞা : পাইলসের কোনো সঠিক সংজ্ঞা এখন পর্যন্ত চিকিৎসকদের জানা নেই। কারণ, এ রোগটি সম্পর্কে এখন পর্যন্ত পুরোপুরি বোধগম্য নয়। পাইলস বলতে আমরা বুঝি মলদ্বারের ভেতরে ফুলে ওঠা রক্তের শিরার মাংসপিণ্ড। এ শিরাগুলোর উৎপত্তির ব্যাপারে বিভিন্ন মতবাদ রয়েছে। এরূপ রক্তের শিরার মাংসপিণ্ড বা ‘কুশন’ সব মানুষেরই রয়েছে। তাই প্রকৃত অর্থে পাইলস বা ‘হেমোরয়েড’ আমরা তখনই বলি, যখন এটি কোনো রূপ উপসর্গ সৃষ্টি করেছে। যেমন- মলদ্বারের বাইরে ঝুলে পড়া মাংসপিণ্ড অথবা রক্ত যাওয়া। প্রত্যেক মানুষের তিনটি পাইলস বা ‘কুশন’ আছে। বড় পাইলসের মাঝখানে ছোট ছোট পাইলসও থাকতে পারে। পায়খানা করার সময় শিরাগুলো কিছুটা ঝুলে পড়ে এবং রক্ত ভর্তি হয়ে ফুলে ওঠে, তার পর ফেটে গিয়ে রক্ত বের হয়।

বয়স : ৩০-৬০ বছর বয়সে এ রোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। ২০ বছর বয়সের নিচে পাইলস খুব একটা দেখা যায় না। পাইলস শনাক্ত করা খুব সহজ কাজ নয়। একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক কেবল যন্ত্রের সাহায্যে পরীক্ষা করে পাইলস শনাক্ত করতে পারেন। কখনো কখনো টয়লেটে বসিয়ে কোঁত দিয়ে দেখতে হয়। আমাদের কাছে বিভিন্ন চিকিৎসক রোগী পাঠান পাইলস আছে বলে, কিন্তু পরীক্ষা করে আমরা হয়তো পাই এনালফিশার, পলিপ অথবা ফিস্টুলা। অর্থাৎ মলদ্বারের যেকোনো রোগকে সবাই পাইলস হিসেবে জানেন। কিন্তু এখানে বিভিন্ন ধরনের রোগ হয়। এ রোগ মহিলাদের চেয়ে পুরুষদের কিছুটা বেশি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ বছর বয়সের ঊর্ধ্বে জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ কোনো না কোনো সময় পাইলসের সমস্যায় ভোগেন।

কারণ : কয়েক শতাব্দীর গবেষণা সত্ত্বেও পাইলসের প্রকৃত কারণ উদঘাটিত হয়নি। তবে কিছু কিছু রোগ পাইলস হওয়াকে ত্বরান্বিত করে যেমন- মলত্যাগে অতিরিক্ত কোঁত দেয়া, অনিয়মিত পায়খানার অভ্যাস, কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া ইত্যাদি। অন্য কিছু কারণ আছে যার জন্য পাইলস হতে পারে যেমন- বংশগত, অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা, অনেকক্ষণ গরমে থাকা, ভারী ওজন তোলা, গর্ভাবস্থা, আঁটসাঁট পোশাক পরা, হরমোনের প্রভাব, আঁশজাতীয় খাবারের অভাব ইত্যাদি।

উপসর্গ : পাইলসের শ্রেণিবিন্যাস : পাইলস দুই প্রকার। যথা-

১) বহিঃস্থিত পাইলস : এ ক্ষেত্রে মলদ্বারের বাইরে ফোলা থাকে এবং কিছুটা ব্যথা বা অস্বস্তি হতে পারে।

২) অভ্যন্তরীণ পাইলস : এ ক্ষেত্রে টয়লেটে টাটকা রক্ত দেখা যায়। কোনো ব্যথা থাকে না। মলত্যাগের শেষে রক্ত যায়। রক্ত ফোঁটায় ফোঁটায় যায় আবার কখনো তীরের বেগে যায়। রক্ত যাওয়ার পর যদি বেশি ব্যথা ও জ্বালাপোড়া হয়, তাহলে এনালফিশার বা ক্যান্সার হতে পারে। রক্ত যেতে যেতে রোগী রক্তশূন্যতায় ভুগতে পারেন। মলদ্বারের বাইরে পাইলস ঝুলে পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে মলত্যাগের পরে শেষে পাইলস আপনাআপনি ভেতরে ঢুকে যেতে পারে অথবা রোগী হাত দিয়ে চাপ দিয়ে ঢুকিয়ে দেন। যখন এটিকে চাপ দিয়ে ঢোকানো যায় না তখন এটিকে চতুর্থ ডিগ্রি পাইলস বলে। রক্ত যাওয়া কখনো একটানা চলে না। প্রথমত, বছরে একবার বা দু’বার যায়। এরপর দুই মাস পরপর যায়। তারপর প্রতি মাসে যায়। শেষে ঘন ঘন রক্ত যায় এবং রক্ত যাওয়ার পরিমাণও বেড়ে যায়। যখন মরা রক্ত যায় বা আমমিশ্রিত রক্ত যায় এবং পায়খানার শুরুতেই রক্ত যায়, তখন আমরা ক্যান্সার বলে সন্দেহ করি। তবে পায়ুপথ বা বৃহদান্ত্রের ক্যান্সারে লাল রক্ত যেতে পারে।

পাইলসের সাধারণত ব্যথা হয় না। থ্রম্বোসিস হলে বা পাইলস বাইরে অতিরিক্ত ঝুলে থাকলে ব্যথা হতে পারে। রোগীদের ধারণা, শুধু পাইলস হলেই রক্ত যায়। সঠিক তথ্য হচ্ছে, পায়ুপথে অসংখ্য রোগের প্রধান লক্ষণ টয়লেটে রক্ত যাওয়া। যেসব রোগে টয়লেটে রক্ত যায় তার মধ্যে রয়েছে পাইলস, এনালফিশার, পলিপ, ক্যান্সার, ফিস্টুলা, আলসারেটিভ কোলাইটিস, রেকটাল প্রোলাপস।

নয় বছর ধরে আমি বৃহদান্ত্র ও পায়ুপথের সমস্যায় ভুগছেন এমন ২৯ হাজার ৬৩৫ জন রোগীর ওপর গবেষণা করে দেখেছি, এদের মধ্যে ১৮ শতাংশ পাইলস, ২ শতাংশ থ্রম্বোসড পাইলস, ৩৫ শতাংশ এনালফিশার, ২.২ শতাংশ পাইলস, ফিস্টুলা ও এনালফিশার একত্রে, ১৫ শতাংশ ফিস্টুলা, ২.৫৫ শতাংশ পায়ুপথ ক্যান্সার, ৩.৫ শতাংশ রেকটাল পলিপ, ২ শতাংশ মলদ্বারে ফোড়া, ১.৮৪ শতাংশ অজানা কারণে মলদ্বারে ব্যথা, ৬ শতাংশ ক্রনিক আমাশয় (আইবিএস), ০.৫ শতাংশ অজানা কারণে রক্ত যাওয়া এবং ০.২৫ শতাংশ অজানা কারণে মলদ্বারে চুলকানি রোগে ভুগছেন।

এ গবেষণার ফলে আমরা দেখতে পাই, মলদ্বারে শুধু পাইলস রোগই হয় না, আরো অনেক রোগ হয়, যা ২০ শতাংশ রোগী পাইলসে আক্রান্ত।

পরীক্ষা-নিরীক্ষা : প্রক্টোস্কপি ও সিগময়ডোস্কপি পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। মলদ্বারের ভেতরে এন্ডোস্কপি যন্ত্র দিয়ে এ পরীক্ষা ছাড়া কখনো সঠিক রোগ নির্ণয় করা সম্ভব নয়। আমরা বেশ কিছু রোগী পেয়েছি, যাদের ফিস্টুলা অপারেশন হয়েছে। রোগীর কখনো রক্ত যায় না, অথচ এ পরীক্ষায় ক্যান্সার ধরা পড়েছে। আবার এমনও দেখেছি, দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে পাইলস অপারেশন করে এসেছেন, কিন্তু পাইলস সারছে না। পরীক্ষা করে দেখেছি ভেতরে ক্যান্সার আছে। রোগীর কোনো উপসর্গ নেই, অথচ ক্যান্সার থাকতে পারে। কিছু দিন আগে একজন রোগী সিঙ্গাপুর থেকে ফিস্টুলা অপারেশন করে এসেছেন। তিনি ভালো হননি, তাই দেখাতে এসেছেন। তার কোনো রক্ত যাওয়ার সমস্যা নেই। আমরা রুটিন চেকআপ হিসেবে সিগময়ডোস্কপি পরীক্ষা করে তার ক্যান্সার শনাক্ত করেছি।

প্রতিরোধের উপায় : এ রোগ প্রতিরোধের উপায় হচ্ছে সময়মতো কোষ্ঠকাঠিন্য ও ডায়রিয়ার চিকিৎসা করা, টয়লেটে বসে বসে পেপার/বই না পড়া, খাবারের সাথে আঁশজাতীয় খাবার যেমন- ফল, সবজি, সালাদ পরিমাণমতো খাওয়া, দৈনিক ছয় থেকে আট গ্লাস পানি পান করা, ভারী ওজন না তোলা, অতিরিক্ত গরমে বেশিক্ষণ না থাকা ইত্যাদি।

LEAVE A REPLY