কোনো ধরনের সংলাপে রাজি হচ্ছে না সরকার

কোনো ধরনের সংলাপে রাজি হচ্ছে না সরকার

0
SHARE

সময় সংবাদ রিপোর্ট:জাতীয় ঐক্যফ্রন্টসহ সরকারবিরোধী নানা দল ও জোটের পাশাপাশি দেশী-বিদেশী নানা পক্ষের চাপ সত্ত্বেও কোনো ধরনের সংলাপে রাজি হচ্ছে না সরকার। আগামী জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংলাপ বা সমঝোতার চিন্তা বাদ রেখে আপাতত আপন গতিতেই চলতে চায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে সরকারবিরোধীদের সব দাবি উপেক্ষা করে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার পথে এগুচ্ছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। ক্ষমতাসীনদের এমন মনোভাব রাজনৈতিক অস্থিরতাকে চাঙ্গা করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আর যেকোনো সঙ্ঘাতমুখর অবস্থা নির্বাচনকে অনিশ্চিত করে তুলতে পারে। এ ধরনের অবস্থায় যার পরিণতি হিসেবে ক্ষমতায় আসতে দেখা যায় সংবিধানবহির্ভূত সরকারকে।

এ মুহূর্তে কোনো ধরনের সংলাপের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গতকাল বলেছেন, ‘নির্বাচনের আর বেশি দিন বাকি নেই। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তফসিল ঘোষণার কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। তাহলে এখন আর ১০-১২ দিনের মধ্যে কে কার সঙ্গে সংলাপ করবে? দেশে সংলাপ করার মতো এমন কোনো পরিবেশও নেই, প্রয়োজনও নেই।’

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এমন এক সময় সংলাপ সমঝোতার ব্যাপারে নেতিবাচক কথা বললেন যখন দেশী-বিদেশী বিভিন্ন পক্ষ অংশীদারিত্বমূলক নির্বাচনের কথা বলছে। বিরোধী দলগুলোর জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কূটনীতিকদের সামনে খোলামেলাভাবে বলেছেন তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। এর মাধ্যমে বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ব্যাপারে যে জল্পনা চলছিল তার অবসান ঘটে। এই অনুষ্ঠানে কূটনীতিকরা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের এমন প্রশ্নও করেন যে তারা সরকারে গেলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন? এর মাধ্যমে নির্বাচন কেন্দ্রিক পরিবেশ সৃষ্টি হবে বলে ধারণা করা হলেও উল্টো প্রভাবই পড়তে দেখা যাচ্ছে এখন। গতকাল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ খোলামেলাভাবে বলেছেন, নির্বাচন নাও হতে পারে। গত কয়েক দিনের রাজনৈতিক মেরুকরণে তাৎপর্যপূর্ণভাবে সরকারি দলের নির্বাচনী ঢামাঢোলে বেশ খানিকটা ভাটা পড়তে দেখা গেছে।

কোনো কোনো রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মন্তব্য করছেন যে, সব দলের অংশগ্রহণের নির্বাচনের কথা সরকারি দলের নেতারা মুখে বললেও ঐক্যবদ্ধ বিরোধী জোটের মোকাবেলা আগামী নির্বাচনে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছে তারা। এ কারণে আওয়ামী লীগ তার নিজস্ব ছকেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য এগোতে চাইছে। তাদের আশঙ্কা এখন সব দল নির্বাচনে অংশগ্রহণের যে সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে তাতে তফসিল ঘোষণার পর মালদ্বীপ বা মালয়েশিয়ার মতো যেকোনো কিছু ঘটতে পারে। এ ধরনের অনিশ্চিত অবস্থার চেয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণের নির্বাচন করাই সমীচীন মনে করছে সরকারি দলের হাইকমান্ড। সংলাপ সমঝোতা বিরোধী বক্তব্য তার অংশবিশেষ হতে পারে বলে এই পর্যবেক্ষকের ধারণা।

বেশ কিছুদিন ধরে আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলগুলোর সাথে সংলাপে বসার জন্য আহ্বান জানিয়ে আসছে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোট। সম্প্রতি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টও একই দাবি জানিয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত প্রভাবশালী দেশগুলোর কূটনীতিকরাও অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে বিরোধী দলগুলোর সাথে সংলাপের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করছে। গত সপ্তাহে প্রভাবশালী দেশগুলোর কূটনীতিকরা নির্বাচন ও অন্যান্য ইস্যুতে বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট ও ভারতের হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল সাক্ষাৎ করেছে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে। এ ছাড়া নবগঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে বৈঠক করেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, জাপানসহ প্রায় ৩০টি দেশের কূটনীতিকরা।

সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সাথে আলোচনা করে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতিনিধিদল। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন ও রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ নিয়ে বিশদ আলাপ হয়। ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে বৈঠকের পর বার্নিকাট আগামী নির্বাচন নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আবারো পরিষ্কার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তারা চায় একটি অবাধ ও অংশগ্রহমূলক নির্বাচন। আর অবাধ নির্বাচনের স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ হতে পারে।’

জানা গেছে, কূটনৈতিকভাবে বিভিন্ন দেশ ও জোট ক্ষমতাসীন দলকে চাপ দিচ্ছে। অনুরোধ করা হচ্ছে, যেন নির্বাচনের আগে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সাথে রাজনৈতিক সংলাপের সূচনা করা হয়। নির্বাচন যেন অংশগ্রহণমূলক হয় সেই কথা বলছে ইইউ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
অথচ দেশী-বিদেশী এমন চাপকে তেমন আমলে নিচ্ছেন না ক্ষমতাসীনরা। অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য সরকারবিরোধীদের দাবি এবং কূটনীতিক ও উন্নয়ন সহযোগীদের চাওয়াকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের অবস্থানে অনড় সরকারের নীতি নির্ধারকরা।

সরকারি দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার সাথে আলাপকালে জানা গেছে, বিএনপিসহ ঐক্যফ্রন্টকে চাপে রেখেই আওয়ামী লীগ তার লক্ষ্যে পৌঁছতে চায়। বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বর্তমানে কারাবন্দী। আগামী ২৯ নভেম্বর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়ের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাসহ একাধিক মামলায় সাজা নিয়ে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরাও ভুতুড়েসহ নানান মামলায় কারাগারে। সব মিলিয়ে বিএনপি বড় ধরনের সঙ্কটে রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। শাসক দলের মূল্যায়ন অনুসারে বিএনপি সরকারবিরোধী বড় ধরনের কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে অক্ষম। অন্য দিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদেরও এমনভাবে চাপে রাখা হবে যাতে তারা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের চিন্তা বাদ দিয়ে নিজেদের ‘পিঠ’ সামলাতেই ব্যস্ত থাকে।

ইতোমধ্যেই ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম উদ্যোক্তা গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা: জাফরুল্লাহর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ একাধিক মামলা হয়েছে। একজন নারী সাংবাদিককে ‘কটুক্তি’র অভিযোগে ঐক্যফ্রন্টের আরেক উদ্যোক্তা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে বিভিন্ন মহল থেকে চাপে রাখার চেষ্টা হচ্ছে। একইভাবে অন্য ঐক্যফ্রন্টের অন্য নেতাদেরও নানাভাবে লাগাম টেনে ধরা হতে পারে। পাশাপাশি ২০ দলীয় জোটের মধ্যে ভাঙনের ব্যাপারেও কড়া নজর থাকবে সরকারের। অন্যদিকে প্রশাসনিক নানা পদক্ষেপের পাশাপাশি ১৪ দলীয় জোট বিরোধীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জবাব দেবে। এভাবে নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়ে যাবে বলে আশা করছে সরকার পক্ষ। এই বিবেচনাতেই সরকারবিরোধীদের সাথে সংলাপ-সমঝোতার আহ্বানে আপাতত সাড়া দিচ্ছে না ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বিএনপির সাথে সংলাপের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনে আসতে বাধ্য হবে। আর না এলে দলটি ধ্বংস হয়ে যাবে। তাদের আর অস্তিত্বই থাকবে না। সে জন্য আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বিএনপির সাথে কোনো ধরনের সংলাপ হবে না সরকারের।

এ দিকে সরকারের একাধিক সূত্র জানায়, সংলাপ বা সমঝোতা নিয়ে সরকার অনড় অবস্থানে থাকলেও ভিন্ন কোনো পরিস্থিতি দেখা দিলে তা যেকোনো সময়ই পাল্টে যেতে পারে। তবে সেটি নির্ভর করছে বিএনপি জোটের সিদ্ধান্ত, কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক চাপ এবং সর্বোপরি দেশের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি, ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোট যদি বড় ধরনের কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে তবেই তাদের সাথে সংলাপের বিষয়টি নিয়ে ভাববেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের দুইজন নেতা জানান, বিএনপির সাথে সংলাপের ব্যাপারে নেতিবাচক অবস্থানে থাকলেও নানামুখী চাপের কারণে মাঝে মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ কেন্দ্রীয় অনেক নেতা। ওবায়দুল কাদের একাধিকবার শর্তহীন খোলামেলা সংলাপের কথা বলেছেন। এ ছাড়া আনুষ্ঠানিক কোনো সংলাপ না হলেও বিএনপি মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাথে টেলিফোনে অনানুষ্ঠানিক সংলাপের কথাও বলেছেন তিনি। নির্বাচনের আগে বড় ধরনের কোনো চাপ এলে শেষ পর্যন্ত বিএনপির সাথে আনুষ্ঠানিক সংলাপে বসতে আপত্তি নেই আওয়ামী লীগের।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, ‘৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে তাদের সাথে সংলাপে বসার জন্য সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল। সংলাপের আহ্বান করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চরম অপমান করেছেন খালেদা জিয়া। তাদের সব ষড়যন্ত্র ও ধ্বংসলীলা মোকাবেলা করে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দেশকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উচ্চমর্যাদার আসনে আসীন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগামী নির্বাচন সাংবিধানিকভাবে হবে। এখানে যেকোনো দল চাইলে অংশ নিতে পারে, আবার দলীয় সিদ্ধান্তের কারণে বর্জনও করতে পারে। এটি তাদের নিজস্ব ব্যাপার। এ নির্বাচন নিয়ে সংলাপের কোনো প্রয়োজন নেই।’

সরকারি দলের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সব সময় সংলাপে বিশ্বাসী। দশম সংসদ নির্বাচনের আগে অনেকবার তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপিকে সংলাপের আহ্বান জানানো হয়েছিল। আমাদের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী নিজে ফোনও করেছিলেন। তখন তারা সংলাপের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছিল। নির্বাচন হয়ে গেছে। এখন পরিস্থিতি স্থিতিশীল। সব স্বাভাবিক গতিতেই চলছে। দেশে আইনের শাসন বিদ্যমান। নির্বাচন যথাসময়ে সাংবিধানিকভাবেই হবে। তাই কোনো দলের সাথে সংলাপের কোনো দরকার আছে বলে আওয়ামী লীগ মনে করে না। কেউ নির্বাচনে না এলে আমাদের কিছুই করার নেই।’

দুই দলের মধ্যে সংলাপ আয়োজনে কূটনীতিকদের দৌড়ঝাঁপের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিদেশী রাষ্ট্রদূতেরা আমাদের অতিথি। যেকোনো সময় তারা আমাদের সাথে কথা বলতে পারেন। তবে আমাদের সিদ্ধান্তগুলো আমরা নিজেরাই নিতে চাই। সেটাই জনগন পছন্দ করবে। এ দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তাদের মাথা ঘামানো কেউ পছন্দ করে না।’

LEAVE A REPLY