ভোট ও জোটের রাজনীতি

ভোট ও জোটের রাজনীতি

0
SHARE

সময় সংবাদ রিপোর্ট:একাদশ সংসদ নির্বাচনের বেশি সময় বাকি নেই। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তফসিল ঘোষণা ও ডিসেম্বরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তাই নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে তত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। নতুন জোটের আবির্ভাব। স্বাধীন বাংলাদেশে গণতন্ত্র হোঁচট খেয়েছে। গণতন্ত্রের যাত্রা ব্যাহত হয়েছে। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে নব্বইয়ে যে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়, এ জন্য অনেক আন্দোলন ও রক্ত ঝরেছে। ক্ষমতা হস্তান্তর বা দাবি আদায় কোনোটাই অতীতে আন্দোলন ছাড়া হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা, বাতিল হওয়া সম্পর্কে সবার কমবেশি জানা আছে। আর এ ধরনের ব্যবস্থা সাময়িক হতে পারে, দীর্ঘমেয়াদি গণতন্ত্রের জন্য মোটেই শুভকর নয়।

গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার বা সরকার পরিবর্তন যা-ই হোক না কেন, আন্দোলন-সংগ্রামে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ যতটা সফল, বিএনপি ততটা সফল নয়। ২০১৩-১৪-তে দেশে যে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হয়েছিল সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের জায়গায় বিএনপি থাকলে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌম রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ ধৈর্য, সাহসিকতা ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে। ২. আমাদের দুর্ভাগ্য যে, স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বড় দুদলের মধ্যে রাজনৈতিক দন্দ্ব-সংঘাত, হানাহানি, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে এক ধরনের রাজনৈতিক খেলা চলছে। উচ্চ আদালতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর থেকে রাজনীতিতে উত্তাপ-উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে। অনির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দৃষ্টান্ত যেমন বাংলাদেশে রয়েছে, তেমনি রয়েছে দুই নেত্রীর রাজনৈতিক তিক্ত অভিজ্ঞতা ও মাইনাস টু ফর্মুলার রাজনীতিও। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আদালত কর্তৃক বাতিল হওয়ায় তা সাংবিধানিকভাবে বাতিল হয়েছে। আদালতের দেওয়া রায়কে উপেক্ষা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে ও বিগত নির্বাচন ঠেকাতে বিএনপি জোট সারাদেশে যে তা-ব চালায়, দেশের জানমালের যে ক্ষতি করে তা এ দেশের মানুষ ভুলে যায়নি। সামনে নির্বাচন। অনেকগুলো দাবি নিয়ে বিএনপি জোটের পরিধি আরও বেড়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতি হচ্ছে ভোট ও জোটের।

নানান আলোচনা ও সমালোচনায় অতিসম্প্রতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে একটি নতুন জোট গঠিত হয়। বি. চৌধুরী আদর্শগত দ্বন্দ্বের কারণে নবগঠিত রাজনৈতিক জোট ঐক্যফ্রন্ট থেকে বেরিয়ে আসেন। বি. চৌধুরীর বিকল্পধারার দাবি ছিল, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জামায়াতের সঙ্গে এ জোটের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। কিন্তু বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্ট বিষয়টিকে তেমনভাবে গুরুত্ব না দেওয়ায় বি. চৌধুরীর বিকল্পধারা জোট ত্যাগ করে।

অনেকের মতে, ঐক্যফ্রন্টের স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে ভেতরে ভেতরে সম্পর্ক রয়েছে। বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতনের যে ডাক দিয়েছে তা হালে পানি পাবে না। বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট কয়েকটি দাবি জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, নিরপেক্ষ সরকার গঠন, সংসদ ভেঙে দেওয়াসহ আরও কিছু দাবি ও শর্ত জুড়ে দিয়েছে। রাজনীতিতে জোট গঠন নতুন কিছু নয়। কিন্তু তাদের দাবি-দাওয়া যদি অযৌক্তিক ও সংবিধানবহির্ভূত না হয়। সরকার তাদের দাবি নাকচ করে দিয়েছে। সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, সংবিধান মোতাবেক নির্বাচন হবে। সংবিধানের বাইরে তারা যাবে না। এ ক্ষেত্রে বিএনপি বা তাদের মিত্র জোট কী করবে? অনেকে বলে থাকেন, বিশেষ করে বিএনপি তো বারবার বলে আসছে, নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে তারা ক্ষমতায় আসবে। কোন দল বা জোট ক্ষমতায় আসবে সেটা জনগণ ভোটের মাধ্যমে তাদের সিদ্ধান্ত জানাবে।

বিএনপি অতীতে এমন কী করেছে যে, তাদের জনসমর্থন বেড়েছে। জনগণ কি বিশ্বাস করে বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশের উন্নয়ন হবে, রাজনৈতিক সহিংসতা-হানাহানি বন্ধ হবে, দুর্নীতি কমবে। প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে, তারা এমন কোনো কাজ করেনি যার ফলে দেশের একটি পরিবর্তন এসেছে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে। তাদের কাছে প্রধান এজেন্ডা হলো খালেদা জিয়ার মুক্তি। একটি দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়া কারাগারে তার মুক্তির ব্যাপারে বিএনপিকে আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। সরকার নয়, আদালত খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়েছে। তাই আইনি লড়াই ছাড়া তার মুক্তির সম্ভাবনা আছে বলে আমার জানা নেই। আইন সবার ঊর্ধ্বে। তবে আইন সবার জন্য সমান কথাটা প্রায়োগিক দিক থেকে সমান হওয়ায় তা সরকারকে প্রমাণ করতে হবে। সরকার টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় এসে দেশের উন্নয়নের পাশাপাশি কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনিয়ম যে হয়নি এমনটা বলা যাবে না। তাই মানুষ হয়তো পরিবর্তন চায়। আবার বিএনপির অতীত কর্মকা-কে মানুষ সমর্থনও করে না। মন্দের ভালো হিসেবে জনগণ আওয়ামী লীগকেই বেছে নেবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ সরকার উন্নয়নের পাশাপাশি সন্ত্রাস, মাদক, জঙ্গিবাদ দমন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগের বিকল্প কোনো দল বাংলাদেশে নেই।

এ দেশের রাজনীতিবিদরা জনগণের ওপর ভরসা রাখতে চান না। যার কারণে বিদেশিদের কাছে ধরনা দেওয়া রাজনীতিতে এ সংস্কৃতি দীর্ঘদিন থেকে রয়েছে। কোনো বিদেশি রাষ্ট্র, সংস্থা, প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি অন্য কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে বলে মনে হয় না। এটা অস্বীকার করা যাবে না, আওয়ামী লীগ দেশের কল্যাণে কাজ করেছে। শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ অবকাঠামো উন্নয়ন, মেগা প্রকল্প, বিশেষ করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর কাজ এখন সমাপ্তির পথে যা দৃশ্যমান। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিসহ অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের কর্মকা- চোখে পড়ার মতো। এক কথায় বলা যায়, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে বলেই দেশ মধ্যম আয়ের পথে। তবে দলীয় কিছু নেতাকর্মী বিশেষ করে অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনে কিছু বিতর্কিত কর্মকা- সরকারের ভালো অর্জনগুলোও ঢাকা পড়ে যায়। উন্নয়ন, দিন বদলের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে গেলেও সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যাহোক রাজনীতিতে ভালো-মন্দ দুটি দিক থাকে। বর্তমান সরকার মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে।

সার্বিক বিবেচনায় এ দেশের মানুষ ভালো অবস্থানে আছে বললে হয়তো ভুল হবে না। আমরা যেমন গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা অব্যাহত দেখতে চাই, তেমনি উন্নয়নও। দেশে যে গণতন্ত্র রয়েছে সেই গণতন্ত্রকে কীভাবে আরও গতিশীল পরিশীলিত করা যায়, কীভাবে দেশের উন্নয়নে নিয়ামক শক্তিতে পরিণত করা যায় সেদিকের প্রতি বর্তমান সরকারের লক্ষ্য রয়েছে বলেই অনির্বাচিত সরকারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু বিএনপি ও নবগঠিত ঐক্যফ্রন্ট খাল কেটে কুমির আনতে চায় যা দেশে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের গতিকে স্তব্ধ করবে। এ দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষ আর সারের সংকট দেখতে চায় না, বিদ্যুতের সংকট দেখতে চায় না, এ দেশের, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের মানুষ মঙ্গার কবলে পড়তে চায় না। তাই বেলাশেষে এ দেশের মানুষ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করবে না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো কিছু আদায় করতে গেলে আন্দোলন-সংগ্রাম ছাড়া হয় না। গত দশ বছরে বিএনপি কোনো আন্দোলন করতে পারেনি, সফল হয়নি।

সাংগঠনিক দিক থেকে বিএনপির অবস্থা ভালো নয়। হয়তো অনেকে বলতে পারেন, সরকার তো বিএনপিকে দৌড়ের ওপর রেখেছে। তাদের অনেক নেতাকর্মী ঘরছাড়া। কিন্তু তা সত্ত্বেও কি বিএনপির পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে? হয়নি। গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পতন ঘটিয়ে তাদের দাবি আদায়ে বাধ্য করা হবে। বিএনপি ও মিত্র জোটের এ ধরনের কথায় জনগণ কি মাঠে নামবে? দেশে এমন কোনো রাজনৈতিক সংকট নেই যার জন্য জনগণ মাঠে নামবে। বিএনপি গত নির্বাচন বয়কট করায় তাদের ভুলের খেসারত দিতে হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি একটি বড় দল এ কথা মানতে হবে। সেই বিএনপির সঙ্গে বেশ কয়েকটি সমমনা দল রয়েছে।

নবগঠিত ঐক্যফ্রন্ট বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু এসব দল, উপদল জোটের নেতাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ এক নয়। তাদের নীতি-আদর্শ শেষ পর্যন্ত রাজনীতিতে কোনো প্রভাব ফেলবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন না। তবে ঐক্যফ্রন্টের কিছু নেতা আছেন, রাজনৈতিক অঙ্গনে তাদের পরিচিতি থাকলেও ভোটের রাজনীতিতে তাদের জনসমর্থন নেই বললেই চলে। বিএনপি ও নতুন জোট জাতীয় ঐক্যে বা সরকার পতনের ডাক দিয়েছে। কিন্তু বর্তমান সরকার এসব বিষয়ে চিন্তিত নয়। তারা সংবিধানের বাইরে যাবে না। প্রচ- গণআন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্তি, নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাসহ তাদের আরও কিছু দাবি আদায়ে সরকারকে বাধ্য করা, যদিও এটা সম্ভব নয় বলে অনেকেই মনে করেন। আর তা যদি না হয় তা হলে সংবিধান মোতাবেক বিএনপিকে নির্বাচনে আসতে হবে। এ দুটি পথ ছড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ নেই। আর তা করতে গিয়ে দেশে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়বে। আস্থাহীনতার রাজনীতিতে কারা জয়ী হবে সেটাই দেখার বিষয়।

LEAVE A REPLY