এবার ভোট বর্জন নয়, কেন্দ্র পাহারা দিতে হবে

এবার ভোট বর্জন নয়, কেন্দ্র পাহারা দিতে হবে

0
SHARE

সময় সংবাদ রিপোর্ট:আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এবার কোনোভাবেই ভোট বর্জন না করার ঘোষণা দিয়েছেন ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। তারা বলেছেন, একবার ভোট বর্জন করে খেসারত দিতে হয়েছে। এবার কোনোভাবেই ভোট বর্জন করা যাবে না। সবাইকে ভোটকেন্দ্রে থাকতে হবে। পাহারা দিতে হবে। গতকাল শনিবার সুপ্রিমকোর্ট চত্বরে জাতীয় আইনজীবী ঐক্যফ্রন্ট আয়োজিত আইনজীবীদের মহাসমাবেশে বক্তারা এ কথা বলেন। সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও আইনজীবী ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীনের সভাপতিত্বে এ মহাসমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষনেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। প্রধান বক্তা ছিলেন বিএনপি মহাসচিব ও ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

অনুষ্ঠানে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘একবার নির্বাচন বয়কট করে ভুগতে হয়েছে। নির্বাচন বয়কট করা যাবে না। শেষ পর্যন্ত লড়ে যেতে হবে। ওরা যতই দশ নম্বরি করুক, আমরা ভোট দিতে যাব। সবাই ভোটকেন্দ্রে থাকব। হাজার হাজার মানুষ ভোটকেন্দ্রে যাব। আগামী নির্বাচনে সবাইকে ভোটকেন্দ্র পাহারা দিতে হবে। দেশের ২ কোটি তরুণ ভোটারকেও এগিয়ে আসতে হবে।’ ড. কামাল বলেন, সরকার প্রতিমুহূর্তে সংবিধান লঙ্ঘন করছে। সকাল, দুপুর, রাত সংবিধান লঙ্ঘন করছে। কোথায় লেখা আছে, ঘোষণা দিয়ে এমপি (বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য) হওয়া যায়! আওয়ামী লীগ নেতাদের উদ্দেশে ড. কামাল বলেন, তোমরা কথায় কথায় সংবিধান সংবিধান করো। আমার তো মনে হয়, তোমরা পড়ালেখা করো না। পড়লে দেখতে, সংবিধানের কোথায় লেখা আছে, ১৫৪ জন সংসদ সদস্য ঘোষণার ভিত্তিতে নির্বাচিত হয়।

তিনি বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর কোর্টে মামলা হয়েছিল। তখন আওয়ামী লীগ কোর্টে বলেছিল, এটা পরিস্থিতি মোকাবিলা করার নির্বাচন, অল্প সময়ে আরেকটি নির্বাচন দেওয়া হবে। তখন কোর্ট আমাকে অ্যামিকাস কিউরি (আদালতের বন্ধু) হিসেবে ডেকেছিলেন। কোর্ট আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন ওই নির্বাচন নিয়ে। তখন বলেছিলাম, এক কথায় বললে তো বলা যায়, এটা কোনো নির্বাচন না। কিন্তু তারা যখন বলছে পরিস্থিতির কারণে নির্বাচন করেছে, দ্রুত আরেকটি নির্বাচন করবে। তাই সুযোগ দেওয়া উচিত। বিশিষ্ট এ আইনজীবী বলেন, দ্রুত নির্বাচন মানে কি পাঁচ বছর? তা হলে ডিকশনারিতে নতুন শব্দ ব্যবহার করতে হবে। এভাবে মানুষের সঙ্গে ভাঁওতাবাজি? ভাঁওতাবাজির জন্য যদি কোনো পুরস্কার থাকে, সেটা তোমাদের পাওয়া উচিত। দশম সংসদের এমপি-মন্ত্রীদের উদ্দেশে ড. কামাল বলেন, বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়ে নির্লজ্জভাবে ৫ বছর কাটিয়ে দিল। এরা চালাল কীভাবে? লজ্জাবোধও নেই। মানুষ হলে তার লজ্জাবোধ থাকে। যাদের মাননীয় মন্ত্রী বলা হয়, এরা কারা? উপদেষ্টা কারা, এমপি কারা? তোমাদের কে বানিয়েছে? তাদের কোনোভাবেই মাননীয় বলা যায় না। কামাল হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ‘এ সরকারের আমলে বিচার বিভাগের ওপর আঘাত এসেছে, বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপ হচ্ছে। নিম্নআদালতের দায়িত্ব পালন অসম্ভব করে দেওয়া হচ্ছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহাকে ষোড়শ সংশোধনীর রায় দেওয়া নিয়ে শাস্তি পেতে হয়েছে। সাতজন বিচারপতি ওই রায়ে স্বাক্ষর করেছেন, কিন্তু একজনকে শাস্তি পেতে হলো।’

খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রসঙ্গে কামাল হোসেন বলেন, ‘তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার কারামুক্তি চাই। যেখানে এতদিন পর একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে যাচ্ছে, সেখানে একটি বড় দলের নেত্রীকে পরিত্যক্ত জেলে রাখা হয়েছে। একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচন করবেন, অন্যজন জেলখানায় থাকবেন, এটা হতে পারে না। তাকে ছাড়াও হাজার হাজার নেতাকর্মীকে কারাগারে রেখে নির্বাচনে বৈষম্য সৃষ্টি করা হচ্ছে। এতে গণতন্ত্র ফিরে আসবে না, সংবিধান সমুন্নত থাকবে না।’

একাদশ নির্বাচনের ‘ভোটযুদ্ধে’ নামার জন্য সবাইকে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জনিয়ে বিএনপি মহাসচিব ও ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘যখন আমরা কোথাও দাঁড়াতে পারি না, যখন আমাদের কথা বলতে দেওয়া হয় না, যখন আমাদের নির্বাচনের জন্য ক্যাম্পেইন করতে দেয় না, আমাদের নেতাকর্মীদের মিথ্যা ও গায়েবি মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে অথবা তাদের পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে তখন আমরা বলছি, এটাকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে, এ নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এ দানবকে পরাজিত করব।’ তিনি বলেন, আমাদের হাতে সময় খুব কম। যদি জাতিকে বাঁচাতে হয়, দেশকে যদি বাঁচাতে হয়, মানুষকে বাঁচাতে হয়, স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে হয়, তা হলে এটাই উপযুক্ত সময়। আসুন সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভোটযুদ্ধে নেমে পড়ি।’ ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, অ্যাডভোকেট নিপুণ রায়সহ আইনজীবীরা সরকারের মিথ্যা মামলায় নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন মির্জা ফখরুল। মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বিচার বিভাগের দিকে তাকিয়ে থাকি। যখন সরকার দ্বারা আক্রান্ত হই তখন এ মহান ভবনে আসি, একটু আশ্রয়ের আশায়। কিন্তু বিচার বিভাগে সেই আশ্রয়টুকুও আজ নেই। বাংলাদেশে বিচারব্যবস্থায় এখন কোনো আইনের শাসন অবশিষ্ট নেই। সরকার তার ইচ্ছামতো বিচারব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

মির্জা ফখরুল আরও বলেন, ‘আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বলতে চাই, দেশের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা এ বন্ধ্যত্বের যুগে, যখন কেউ কোনো প্রতিবাদ করে না, সত্য বলে না, তখন ওই মানুষটি দাঁড়িয়েছিলেন, প্রতিবাদ করেছিলেন। তিনি সত্য রায় দিয়েছিলেন, সত্য বলেছিলেন। এ জন্য সরকার তাকে জোরজবরদস্তি করে দেশ থেকে বের করে দিয়েছে।’ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের জবাবে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘ওবায়দুল কাদের সাহেব বলেছেন, সব সাম্প্রদায়িক শক্তি এখন ধানের শীষে। এ কথার আমি প্রতিবাদ করছি। একটা কথা আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, সাম্প্রদায়িক শক্তিকে আপনরাই প্রশ্রয় দিয়েছেন এবং দিচ্ছেন। জাতি জানে কখন কী করেছেন। কারা একসঙ্গে বসে যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে আন্দোলন করেছেন সবাই জানে। এখনো তাদের সঙ্গে বসে কাওমি জননী হয়ে গেছেন এটা সবাই জানে।’ নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘এ কমিশন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো সুষ্ঠুভাবে করতে পারেনি, জাতীয় নির্বাচন কীভাবে সুষ্ঠু, অবাধ করবে? লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করুন, সবাইকে সমান সুযোগ দিতে হবে, অন্যথায় নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না।’ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, যে কারণে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম, ৪৭ বছর পর স্বাধীনতার সেই মূল চেতনা আর নেই। এ সময়ের মধ্যে বিচার বিভাগ, জনগণ, মানুষের স্বাধীনতা হারিয়েছে। শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে মওদুদ বলেন, এ নির্বাচনে একটি ঐক্য প্রয়োজন। ড. কামাল হোসেনকে বলেছি আপনি এগিয়ে আসুন, ১৬ কোটি মানুষের নেতৃত্ব দিন। এর পর ড. কামাল এলেন, নেতৃত্ব দিলেন। আন্দোলনের অংশ হিসেবেই এ নির্বাচনে এলাম। অথচ সেই নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপির নেতাকর্মীরা যখন শোডাউন নিয়ে মনোনয়ন ফরম নিতে এলো, তখন হেলমেট পরে ছাত্রলীগ-যুবলীগ তাদের ওপর হামলা চালাল। তাদের এ হামলা নির্বাচনকে ঘিরে আমাদের যে গতি তা নিবারণের জন্য। তবু আমরা নির্বাচনে আছি এবং থাকব। ধানের শীষের জোয়ারে নৌকা ভেসে যাবে। আইনজীবী ঐক্যফ্রন্টের সদস্য সচিব ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন ও অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়ার সঞ্চালনায় মহাসমাবেশে সাবেক স্পিকার ও বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, খন্দকার মাহবুব হোসেন, নিতাই রায়চৌধুরী, মীর নাছির উদ্দিন, এমএ রকীব, সুব্রত চৌধুরী, তৈমুর আলম খন্দকার, মজিবুর রহমান সারোয়ার, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালসহ সারাদেশের বিভিন্ন আইনজীবী সমিতির নেতারা বক্তব্য রাখেন।

LEAVE A REPLY