চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ !

চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ !

0
SHARE

সময় সংবাদ রিপোর্ট:যখন কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রে পারস্পরিক সহনশীলতা, শ্রদ্ধাবোধ, গণতন্ত্রচর্চা ও আইনের শাসনের সংকট দেখা দেয়, তখন একশ্রেণীর মানুষ এর সুযোগ নেয় এবং অর্থনৈতিক দুর্নীতি, আদর্শহীন রাজনৈতিক সংস্কৃতিচর্চা ও স্বেচ্ছাচারী আচরণ শুরু করে।

এতে চরম ভোগান্তির শিকার হয় রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ। আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয় গোটা দেশ। সর্বগ্রাসী সেই দুর্নীতি তখন প্রবেশ করে সমাজের প্রতিটি স্তরে।

বর্তমানে এরকম এক মহাসংকটময় সময় অতিবাহিত করছে বাংলাদেশ। মানুষ আজ ন্যায়নীতি, আদর্শ আর মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য দুর্নীতির আশ্রয় নিচ্ছে।

ফলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে দিন দিন। প্রশাসন থেকে শুরু করে এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে দুর্নীতি প্রবেশ করেনি।

আমাদের দেশে মাদকের প্রভাব ব্যাপক। বিশেষ করে ফেনসিডিল এবং ইয়াবার সর্বনাশা থাবা আমাদের যুবসমাজকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংসের পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি এসব মাদক ব্যবসায় যেহেতু প্রচুর মুনাফা লাভের সুযোগ থাকে, এ কারণে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ মাদক ব্যবসা ও পাচারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে চলে গেছে, দীর্ঘদিন দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়েও এর কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না। অভিযানে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত চিহ্নিত রাঘববোয়ালদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারায় মাদক পাচার বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

ইতঃপূর্বে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ অভিযানে সাফল্য অর্জনে যে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছিল, তা সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। বস্তুত মাদক অভিযানে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি বলে এ অভিযান মুখ থুবড়ে পড়েছে বলা যায়।

মাদক অভিযানের শুরুতে একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশের এলিট ফোর্স র‌্যাবের ডিজি বেনজীর আহমেদের মাদকবিরোধী অতি উৎসাহী বক্তব্যের কথা মনে পড়ে গেল।

সম্ভবত তারই উৎসাহে তৈরি র‌্যাবের সবচেয়ে দৃষ্টি আকর্ষণীয় স্লোগানসংবলিত একটি পোস্টার এখন আর কোথাও দেখা যায় না। স্লোগানটি ছিল এরকম- ‘চলো যাই যুদ্ধে মাদকের বিরুদ্ধে।’ যুদ্ধের যদি এ নমুনা হয়, তাহলে সাফল্যের মুখ আমরা দেখব কী করে?

এখন সাধারণ মানুষ যদি মনে করে- এ যুদ্ধ ছিল পেটের দায়ে মাদক বহনকারী এবং ক্ষুদ্র মাদক বিক্রেতাদের আটক করা এবং অভিযানের নামে বিচারবহির্ভূতভাবে গুলি করে হত্যা করা, তাহলে দোষের কিছু দেখি না।

এ অভিযানে স্বীকৃত আমদানি ও উৎপাদনকারী মাদক ব্যবসায়ীরা এখনও রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এসব ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরই কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার সরাসরি সহযোগিতায় আজ অবধি মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে নির্দ্বিধায়।

নির্লজ্জ এসব কর্মকর্তা মাদকদ্রব্য উদ্ধার তো দূরে থাক, মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাদকদ্রব্য উদ্ধার করে আবার সেই মাদক ব্যবসায়ীদের কাছেই বিক্রয় করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

এ বক্তব্যের স্বপক্ষে একটি উদাহরণই যথেষ্ট বলে মনে হয়। গত বছর ২৭ অক্টোবর কক্সবাজার জেলার টেকনাফ থেকে ১০ লাখ ইয়াবা উদ্ধারের পর ১০ হাজার পিস উদ্ধার দেখিয়ে একটি মামলা করা হয়; বাকি ৯ লাখ ৯০ হাজার পিস ইয়াবা এক পেশাদার মাদক ব্যবসায়ীর মাধ্যমে বিক্রি করে দেয়া হয় এবং বিক্রয়লব্ধ ৮ কোটি টাকা পুলিশ কর্মকর্তারা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়।

ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর পুলিশের এক তদন্তে জেলা পুলিশ সুপার, দু’জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারসহ পুলিশের ১২ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়; কিন্তু অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, তা অন্ধকারেই রয়ে গেছে।

এক খবরে জানা গেছে, গত মাসে অভিযুক্ত পুলিশ সুপার ড. একেএম ইকবাল হোসেনকে বদলি করা হয়েছে। এতদিন তিনি বহাল তবিয়তেই কক্সবাজার জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ইতঃপূর্বে অভিযুক্ত দুই অতিরিক্ত পুলিশ সুপারসহ অন্য সদস্যদের অন্যত্র বদলি করা হয়েছে।

কিছু দুষ্ট ও চরিত্রহীন পুলিশ সদস্যের অপকর্মের জন্য পুরো বাহিনীকে দায়ী করা ঠিক হবে না। কিন্তু অঘটন ঘটানোর পর যথাসাধ্য কম সময়ে যদি দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যুক্তিসঙ্গত ব্যবস্থা গ্রহণ করা না যায়, তাহলে জনমনে সন্দেহ ও অসন্তোষ দেখা দিতেই পারে। এজন্য তাদের দায়ী করা যায় না।

একটি শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে যখন এরকম অভিযোগ উত্থাপিত হয় এবং সে অভিযোগের সংবাদ যখন বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে দেশের সাধারণ জনগণের কাছে পৌঁছে যায়, তখন দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের সংবাদ সবাইকে জানিয়ে দেয়াই উত্তম।

এত বড় একটি বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে এরকম দু-চারটা ঘটনা ঘটতেই পারে; কিন্তু অপকর্মের জন্য সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করার সংবাদটি জানা গেলে জনমনে আর সন্দেহের অবকাশ থাকে না।

কিন্তু প্রায়ই আমরা লক্ষ করি, বদনাম হবে ভেবে অনেক বড় বড় অপকর্মও ধামাচাপা দেয়ার একটা চেষ্টা থাকে। ফলে সংশ্লিষ্ট বাহিনী সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ভেতর বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। আর এজন্য পুরো বাহিনীকে দায়ভার বহন করতে হয়।

ইতঃপূর্বে এরকম আরও অনেক ঘটনা ঘটেছে বলে মানুষের সন্দেহকে তো আর দূর করা যায় না। এ ব্যাপারে দেশের অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের উদাহরণ থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করা যেতে পারে।

আমাদের দেশে তিনটি পর্যায়ে দুর্নীতি হতে দেখা যায়। ক্ষমতাসীন ব্যক্তি ও তাদের প্রশ্রয়ে থাকা ব্যক্তিদের দুর্নীতি, সরকারি আমলা বা কর্মচারীদের দুর্নীতি এবং বেসরকারি পর্যায়ে সংগঠিত দুর্নীতি।

তবে দেখা গেছে, এদেশের বড় দুর্নীতিগুলো সরকারি প্রশাসনের প্রশ্রয়ে সংগঠিত হয়ে থাকে। এতে উঁচু স্তরের আমলা থেকে শুরু করে সাধারণ সরকারি কর্মচারী সবাই জড়িত থাকে। এর মধ্যে ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তা ও তাদের দোসর কর্মচারীরা এ দলের অন্তর্ভুক্ত। অথচ প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও দুর্নীতিগ্রস্ত এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে খুব কমই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার নজির দেখা যায়।

আমাদের দেশে সব আমলেই প্রশাসনে লোক নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বত্র দলীয় রাজনৈতিক বিবেচনা অগ্রাধিকার পেয়ে আসছে। প্রায় ক্ষেত্রে দেখা যায়, দলীয় ব্যক্তিরা অযোগ্য হলেও নির্লজ্জ অন্ধ আনুগত্য দেখিয়ে পদোন্নতি বাগিয়ে নিচ্ছে এবং কর্তৃপক্ষও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে এদেরই আবার নিয়োগ দিচ্ছে।

ফলে প্রশাসনের ওপর এদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ ঘটে এবং সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা বিভিন্ন অপকর্ম করার সাহস পায়। অতীতে প্রশাসনিক দুর্বৃত্তায়নে এ ধরনের নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদেরই বেশি জড়িত থাকতে দেখা গেছে।

অপরদিকে অপকর্ম করে ধরা পড়লেও এরা কর্তৃপক্ষের একধরনের অনুকম্পা পেয়ে এসেছে। এক্ষেত্রে বহুল আলোচিত ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট জমাদানকারী সচিবদের উদাহরণ আমরা দেখতে পাই। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা প্রমাণিত হওয়ার পরও এসব সচিবের বিরুদ্ধে আদৌ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে কি না, তা আমাদের জানা নেই।

প্রশাসনিক ক্যাডারভুক্ত অপরাধীদের বিরুদ্ধে শাস্তি না দেয়ার এ প্রবণতা দেশের অন্যান্য সেক্টরে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্পষ্ট বৈষম্যের সৃষ্টি করে। সন্দেহ নেই, সম্প্রতি সংসদে দুর্নীতি মামলায় পূর্বানুমতি ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গ্রেফতার না করার যে বিধান পাস হয়েছে, তা এ বৈষম্যকে আরও প্রকট করে তুলবে।

বিধিমালায় দুর্নীতির সংজ্ঞা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল- সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সরাসরি ঘুষ গ্রহণকে এ বিধিমালায় দুর্নীতির সংজ্ঞাভুক্তই করা হয়নি।

স্পষ্ট ধারণা করা যায়- আলোচিত বিধিমালায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যে ছাড় দেয়া হয়েছে, তাতে অসাধু ব্যক্তিরা আরও বেশি সাহসী হয়ে উঠবে এবং দুর্বলচিত্তের ব্যক্তিদের দুর্নীতিপরায়ণে উৎসাহিত করবে।

বাংলাদেশের সর্বস্তরে দুর্নীতির বিস্তার এমনভাবে বাসা বেঁধেছে যে, সাধারণ মানুষের জীবনের জন্য তা নাভিশ্বাস হয়ে উঠেছে। ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতির দৌরাত্ম্যে জনজীবন আজ বিপর্যস্ত। কিন্তু এভাবে আর বেশিদিন চলতে দেয়া যায় না।

দুঃসহ এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ প্রয়োজন এবং তা যত শিগগিরই হয়, তার চেষ্টা করা উচিত। এর জন্য সর্বপ্রথম চাই রাজনৈতিক সদিচ্ছা। প্রয়োজনে সর্বাত্মক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, যেন সমাজ থেকে একচেটিয়া ক্ষমতার অপব্যবহার দূর হয় এবং নৈরাজ্য রোধে রাজনৈতিক দলগুলো সদিচ্ছা দেখায়।

LEAVE A REPLY