ইতিহাস গড়ে নৌকার জয়

ইতিহাস গড়ে নৌকার জয়

0
SHARE

সময় সংবাদ রিপোর্ট:রেকর্ড গড়ল আওয়ামী লীগ। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গতকাল রবিবার সারাদেশে একযোগে অনুষ্ঠিত ভোটে বিশাল বিজয় পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের প্রতীক নৌকা। এই বিজয়ের মাধ্যমে সৃষ্টি  হয়েছে নতুন ইতিহাস। টানা তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়ে আগামী ৫ বছর দেশ পরিচালনার দায়িত্বগ্রহণ করতে যাচ্ছে ক্ষমতাসীনরা। এরই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে। বাংলাদেশের ইতিহাসে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে কোনো দল এর আগে এত বড় বিজয় পায়নি। বেসরকারি ফলে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট পেয়েছে ২৮৮ আসন, এর মধ্যে আওয়ামী লীগ পেয়েছে ২৫৮ আসন।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট পেয়েছে ৯টি আসন, যার মধ্যে বিএনপির রয়েছে ৬টি। এছাড়া স্বতন্ত্র  প্রার্থী পেয়েছেন ২টি আসন।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৬০টি আসন পেয়ে বিজয়ী হয়েছিল। পাকিস্তান পিপলস পার্টি পেয়েছিল ৮৩ আসন। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে বিএনপি পেয়েছিল ২০৭টি আসন, আওয়ামী লীগ ৫৪টি। সংসদীয় ব্যবস্থা চালুর পর ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১৬ আসনে জয়ী হয়, আওয়ামী লীগ পায় ৬২ আসন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২৬৩টি এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট পায় ৩৩ আসন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপিসহ অধিকাংশ দলই অংশগ্রহণ করেনি। ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৪টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো প্রার্থী না থাকায় বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাংসদ হন ১৫৪ জন।
গতকাল রবিবার বিচ্ছিন্ন সহিংস ঘটনা ছাড়া সারাদেশে উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয় একাদশ সংসদ নির্বাচন। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ২৯৯টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়। ভোট চলার সময় অন্তত ৬৯ প্রার্থী নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। এ নির্বাচনকে ঘিরে সংঘাত-সহিংসতায় প্রাণ গেছে অন্তত ১৯ জনের। এদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। গতকাল দিনভর ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকলেও ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার পর ফের থ্রি জি ও ফোর জি সেবা চালু হয়।
সন্ধ্যায় রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের প্রধান কার্যালয়ে দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান এইচটি ইমাম বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে যে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও পরিচ্ছন্ন নির্বাচন সম্ভব, তা প্রমাণ হয়েছে এবারের নির্বাচনে।
অন্যদিকে রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষনেতা ড. কামাল হোসেন ফল প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। তাই সদ্য অনুষ্ঠিত নির্বাচন বাতিল করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচনের দাবি জানান তিনি।
এবারের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে ৯০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। ভোটার উপস্থিতির তুলনায় ভোট পড়ার হার বেশি বলে মনে করছেন অনেকে। অসমর্থিত সূত্রের ভোটের বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবারই মহাজোট প্রার্থীদের সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান অনেক। কোথাও কোথাও ব্যবধান আড়াই লাখ থেকে প্রায় তিন লাখ। ২০০১ সালে এসব আসনের বেশ কয়েকটি এবং ২০০৮ সালেও কয়েকটি আসনে বিএনপি জয়ী হয়েছিল।
এ বিপুল বিজয়ে এখনো পর্যন্ত আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট কোনো প্রার্থীর পরাজয়ের খবর পাওয়া যায়নি। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত জাতীয় পার্টি ছাড়া মহাজোটের শরিক দলগুলোর কোনো প্রার্থীরই পরাজয়ের সংবাদ পাওয়া যায়নি।
এমন ভরাডুবির পর বিএনপি এখন কী করবে?Ñ এমন প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক মহলে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল সন্ধ্যায় নির্বাচনী এলাকা ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকায় এসেছেন। দলের নীতিনির্ধারকরা আলোচনা করছেন। বিএনপির যারা বিজয়ী হয়েছেন, তারা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন কিনা, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। এ বিষয়ে গত রাতে বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্টের নেতারা অল্পবিস্তর আলোচনা করেছেন। নির্বাচন কমিশন ঘেরাওয়ের মাধ্যমে আন্দোলনে নামার প্রস্তাব দিয়েছেন কেউ কেউ।
ভোটগ্রহণ শেষে আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ জানান, মানুষের প্রত্যাশিত ভোটের উৎসব সম্পন্ন হয়েছে। ২৯৩ আসনে ভোট উৎসব হয়েছে ব্যালটের মাধ্যমে। আর ৬টি আসনে ভোট উৎসব ছিল ইভিএমে। ৪০ হাজার কেন্দ্রের মধ্যে গোলযোগ ও অনিয়মের কারণে ২২টিতে ভোটগ্রহণ স্থগিত হয়েছে। তিনি বলেন, কিছু জায়গায় সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে বলে কমিশনের নজরে এসেছে। কমিশন সহিংসতা ঘটনার কেন্দ্রগুলোর প্রতিটিতে তদন্তসাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন।
এর আগে সকালে রাজধানীর সিটি কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এ সময় তিনি বলেন, নৌকার জয় হবে। হবেই। পাশাপাশি তিনি এ-ও জানান, নির্বাচনে যে ফলই আসুক না কেন, তিনি ও তার দল তা মেনে নেবেন।
বেলা ১২টার দিকে ড. কামাল হোসেন বলেন, আমি কারও মুখে কোনো আনন্দ-উল্লাস দেখছি না। যা খবর পাচ্ছি তা উদ্বেগজনক।
বেলা ১১টার দিকে উত্তরায় ভোট দেওয়ার পর সিইসি কেএম নূরুল হুদা বলেন, এখন পর্যন্ত সারাদেশে নির্বাচনের পরিবেশ ভালো। কিছু জায়গায় বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে।
ভোট দিতে গিয়ে নিজের ভোটকেন্দ্রে বিরোধী দলের কোনো পোলিং এজেন্ট পাননি বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। রাজধানীর ইস্পাহানী গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সকাল থেকেই আমি অসংখ্য টেলিফোন পেয়েছি। আমার কাছে অসংখ্য অভিযোগ এসেছে। কমিশনার হিসেবে আমার একক কোনো দায়িত্ব আছে বলে এখন আর আমি মনে করি না।
দুপুরে ভোটগ্রহণের মাঝপথে কারচুপি, কেন্দ্র দখল ও ধানের শীষ প্রতীকের পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের নেতৃত্বে আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে যায় বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল। এ সময় লিখিত অভিযোগে কমিশনকে বিএনপি জানায়, শনিবার রাতে দেড় শতাধিক ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ভোটগ্রহণের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের সহযোগিতায় ৪০০ থেকে ৫০০ ব্যালট বাক্স ভর্তি করা হয়। নির্বাচন শুরুর আগে প্রায় ২৫০টি আসনে ধানের শীষ প্রতীকের এজেন্টদের বাধা দেওয়া হয়েছে। ২২১টি আসনে নানা অনিয়মের অভিযোগ ইসিতে জানিয়েছে বিএনপি।
সকাল থেকে কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কিছুটা কম দেখা গেছে। সময় গড়ালে ভোটারও বাড়তে থাকে। উৎসাহের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অনেকে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে কেন্দ্রে যান। রাজধানীর বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দেন নারীরা। তারুণ্যের উপস্থিতিও ছিল লক্ষণীয়। নির্বাচনের আগের রাতে সারাদেশের কয়েকটি স্থানে বিচ্ছিন্ন কিছু সহিংসতার কথা জানা গেলেও রাজধানীতে বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
এবারের ভোট নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন বিদেশি পর্যবেক্ষকরা। ঢাকার বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র সরেজমিনে ঘুরে দেখার পর ভারতের পর্যবেক্ষক গৌতম ঘোষ সাংবাদিকদের বলেন, স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষ ভোট দিচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারতের নির্বাচনের মধ্যে কোনো মিল আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি একই জিনিস দেখতে পাচ্ছি। সেখানেও জনগণ লাইনে দাঁড়িয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দেয়। এখানেও তাই।
এদিকে ঢাকায় নির্বাচন ভবনের ফোয়ারা প্রাঙ্গণে বিশেষ মঞ্চ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করা হয়। বিভাগ অনুসারে ৮টি এলইডি টিভিতে এ ফল প্রদর্শন করা হয়। এ ছাড়া দলীয় এবং কেন্দ্রীয়ভাবে দুটি মনিটরে পৃথকভাবে ফল দেখানো হয়। এ সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সর্বশেষ, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা গোপালগঞ্জ-৩ আসনে বিজয়ী হয়েছেন। ইসি ঘোষিত ফল অনুসারে শেখ হাসিনা পেয়েছেন ২ লাখ ২৯ হাজার ৫৩৯ ভোট, প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষের প্রার্থী পেয়েছেন ১২৩ ভোট। শেখ হাসিনাকে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত ঘোষণা করেছে ইসি।
এবার ভোটার সংখ্যা ১০ কোটি ৪২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৭৭; এর মধ্যে পুরুষ ৫ কোটি ২৫ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৫ এবং নারী ৫ কোটি ১৬ লাখ ৬৬ হাজার ৩১২। অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৩৯টি। তবে জোটের আড়ালে বেশ কয়েকটি অনিবন্ধিত দলের নেতা নিবন্ধিত দলের প্রতীকে প্রার্থী হন। এ নির্বাচনে সব মিলিয়ে প্রার্থী রয়েছেন ১ হাজার ৮৬১ জন। ৪০ হাজার ১৮৩টি ভোটকেন্দ্রের ২ লাখ ৫ হাজার ৬৯১টি ভোটকক্ষে ভোটগ্রহণ করা হয়।
নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভোটের মাঠে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিভিন্ন বাহিনীর ৬ লাখ ৮ হাজার এবং বাকি ৬৮ হাজার ৬১০ জন সদস্য নিয়োজিত আছে। এর মধ্যে ১ লাখ ২১ হাজার পুলিশ; ৪ লাখ ৪৬ হাজার আনসার এবং ৪১ হাজার গ্রামপুলিশ। ৬০০ প্লাটুন র‌্যাব এবং ৯৮৩ প্লাটুন বিজিবি সদস্যও দায়িত্ব পালন করেন ভোটের মাঠে। এর বাইরে ৩৮৯ উপজেলায় ৪১৪ প্লাটুন সেনাসদস্য, ১৮ উপজেলায় নৌবাহিনীর ৪৮ প্লাটুন এবং ১২ উপজেলায় ৪২ প্লাটুন কোস্টগার্ড সদস্য ভোটের দায়িত্ব পালন করেন। সারাদেশে ১ হাজার ৩২৮ নির্বাহী হাকিম এবং ৬৪০ বিচারিক হাকিম আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ১২২টি নির্বাচনী তদন্ত কমিটির ২৪৪ সদস্য ছিলেন ভোটের মাঠে।

LEAVE A REPLY